১৯৪৭ সালের ভারত- পাকিস্তান দেশ ভাগের পরে দেশ দুটির মধ্যে সম্পর্ক মোটেও ভালো ছিলো না। অন্যান্য সমস্যা থাকার পরেও কাশ্মীর নিয়ে দেশ দুটির সম্পর্ক যে ছিল দা- কুমড়োর এটা কার না জানা। পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হতে হতেই চীনের সাথে বিভিন্ন সীমান্ত বিরোধের জেরে বাধে ১৯৬২ চীন-ভারত যুদ্ধ। সেই যুদ্ধে ভারতের বহু এলাকা চীন দখল করে নেয় এবং অনেক এলাকা নিজেদের বলে দাবি জানায়। এই সুযোগের অপেক্ষার প্রহর গুনছিলো পাকিস্তান। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইউব উক্ত সুযোগকে কাজে লাগানোর প্রয়াস চালায়। ১৯৬৫ সালের ৬ আগস্ট কাশ্মীর ন্যশনাল কনফারেন্স তাদের নেতা শেখ আব্দুল্লাহর গ্রেফতার দিবস পালনের ঘোষনা দেয়। জেনারেল আইউব পরিকল্পনা আটেন যে যেহেতু ভারতের মাথায় ৬২'র যুদ্ধের হারের একটি গ্লানি আছে তার মধ্যে কাশ্মীরের বিশাল অংশের লোক চায় না ভারতকে তাই ৬ আগস্টে শ্রীনগরে বড় ধরনের গোলযোগ তৈরি করতে পারলে তা কাশ্মীর দখলের অধিকতর সুবিধা পাওয়া যাবে। পাকিস্তানের পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা বিপুল পরিমান উপজাতী সংগ্রহ করেন উপজাতীয় এলাকা থেকে। তাদের জন্যে হালকা অস্ত্র ও খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। যেহেতু, বর্ডারক্রস করা খুবই বিপদজনক তাই পাকিস্তান বিমানবাহিনী দিয়ে কাশ্মীরের উরি-পুঞ্চ এলাকা দিয়ে এয়ার ড্রপিং এর মাধ্যমে অনুপ্রবেশ করায়। তারা শ্রীনগরের দিকে যেতে থাকে কিন্তু বিপত্তি ঘটে, উপজাতীয়দের পোশাক আশাক চেহারা সুরত মিলে না তাই কাশ্মীরের স্থানীয় জনগন এদের চিনে ফেলে এবং সাথে সাথে তারা নিকট পুলিশ স্টেশনে জানায় সেখান থেকে বেতারের মাধ্যমে শ্রীনগরে সেখান থেকে কাশ্মীরে, পরে দিল্লি। ভারতীয় বাহিনী বিদেশী আক্রমনের খবর পেয়ে সাথে সাথে ব্যবস্থা গ্রহন করে। পিছন দিক থেকে ভারতীয় সেনাবাহিনী ঘিরে ফেলে বহিরাগতদের। গোপন বেতারে এই খবর চলে যায় পাকিস্তানে।
জেনারেল আইউব উপজাতী পাকিস্তানীদের বাচানোর জন্য জেনারেল আখতার হোসাইন মালিকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর নিয়মিত ইউনিট প্রেরন করে। পাকিস্তান কাশ্মীর সীমান্ত দিয়ে আক্রমন চালানোতে শুরু হয় ভারত পাকিস্তান ১৯৬৫ সালের যুদ্ধ। শুরুতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সুফল পাওয়ায় উচ্চাভিলাষী জেনারেল আইউব সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেয় কাশ্মীরের রাজধানী শ্রীনগরের দিকে যেতে। আইউব খান এতোই উৎসাহী ছিলেন যে সে তার নিজের রাজধানী রক্ষায় পর্যাপ্ত সেনাবাহিনী মজুদ রাখেনি। ওই দিক দিয়ে ভারতও বসে থাকেনি তারা আক্রান্ত হওয়ার সাথে সাথেই আন্তর্জাতিক সীমান্ত নীতি ভঙ্গ করে বিভিন্ন বর্ডার দিয়ে আক্রমন পরিচালনা করে।
আক্রমনের পরে কাল বিলম্ব না করে জেনারেল আইউব নিজের হাতে কমান্ড তুলে নেয় এবং শ্রীনগর অভিমুখে যাওয়া সেনা ইউনিটগুলোকে দ্রুত খেমকারান সেক্টরে এসে ভারতীয় আক্রমন প্রতিহত করতে আদেশ দেন। শ্রীনগরের যে সব ইউনিট গুলো আক্রমনে গিয়েছিলো তার সবার শেষে ছিলো পাকিস্তানের অনাধুনিক একটি ইউনিট - ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট (বাংলাদেশের সন্তানেরা)। এই ইউনিটের সেনারা (বাংলাদেশ) তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তানের হওয়ায় এর নামকরন করা হয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট।সবার শেষে উক্ত ইউনিট থাকায় মুখ ঘুরে হয়ে যায় সবার সামনে। ভারতীয় আক্রমনে পাকিস্তান রক্ষার গুরু দায়িত্ব পরে তাদের উপর।যুদ্ধের ইতিহাসে খেমকারান সেক্টরে বাংলাদেশীরা এক বীরত্বগাথা ইতিহাস ইতিহাস গড়ে।
বাংলাদেশী সেনাদের নিয়ে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের প্রচন্ড প্রতিরোধের ফলে পিছু হটে ভারতীয় সেনাবাহিনী। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপর দায়িত্ব পরে পাকিস্তানের রাজধানী লাহোর ,বামবাওয়ালি, রাভি- বেদিয়ানের ক্যানেলের মত গুরুত্বপুর্ন স্থান।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাংলাদেশী সেনারা শুধু প্রতিরোধই করেনি রীতিমতো ঝাপিয়ে পরেছিলো ভারতীয় বাহিনীর উপর। ভারতীয় সেনাবাহিনী ভাবেও নি যে একটি অখ্যাত ইউনিট দ্বারা তারা এত তীব্র আক্রমনের শিকার হবে। ভারতীয় বাহিনী একদম লাহোরের কাছেই চলে গিয়েছিলো পাকিস্তানের এমন অবস্থা দেখে ভারতীয় চীফ অফ স্টাফ জয়ন্ত নাথ চৌধুরী বলেছিলেন যে তিনি " লাহোরে গিয়েই চা পান করবেন "। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট তা হতে দেয় নি তারা সেইদিন রাজধানী রক্ষা করেছিলো বীর বিক্রমে।
তৎকালীন মেজর জিয়ার নেতৃত্বে ৪৬৬ জনের একটি ডিভিশন লাহোরের রক্ষায় অংশগ্রহন করেন। এই যুদ্ধ বাংলাদেশী সৈনিক তাজুল ইসলাম (এনসিও) বুকে বোমা নিয়ে ভারতীয় আগুয়ান ট্যাংকের উপর ঝাপিয়ে পরে প্রতিরোধ করে। বৈমানিক মোহাম্মদ মাহমুদুল আলম এফ-৮৬ সাব বিমান দিয়ে ভারতীয় ৫টি হকার হান্টার বিমান ভূপাতিত করেছিলেন। সম্পূর্ণ যুদ্ধে তিনি মোট ৯টি বিমান ভূপাতিত করেছিলেন। বৈমানিক লিভিং ঈগল নামে বিশ্বে সমাদৃত সাইফুল আজম ডগফাইটে ১টি জঙ্গীবিমান ভূপাতিত করেছিলেন। ভারতীয় অনেক ট্যাংক ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাতে হস্তগত হয়।
১৯৬৫ সালের যুদ্ধের কাছুর-খেমকারান সেক্টরে ভারতীয় বাহিনীর কাছ থেকে দখল করা PT-76 ট্যাংক আজো চট্টগ্রাম টাইগার্স মিউজিয়ামের সামনে ইতিহাস হয়ে আছে। কেউ দেখতে চাইলে দেখতে যেতে পারেন। যুদ্ধের বিজয়ের খবর ছড়িয়ে পরে সারা পাকিস্তানে। বাংলাদেশীদের যুদ্ধের পরে দেওয়া হয় বীরের মর্যাদা ।পাকিস্তানের ইতিহাসে এত সংখ্যক সর্বোচ্চ পদক এখন পর্যন্ত কোন রেজিমেন্ট এককভাবে পায় নি। যেটি অর্জন করেছিল সেই সময় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। সিতারা-ই-জুরাত ৩ টি ,তমঘা-ই-জুরাত ৮টি ,তমঘা-ই-বাসালাত। আমরা আমাদের দেশের সেই বীরদের শ্রদ্ধাভরে স্মরন করি।
যেই পাকিস্তান বা পাকিস্তানিদের রক্ষার জন্যে আমাদের বাংলাদেশীরা জীবন বাজি রেখে ১৯৬৫ এর যুদ্ধে চরম বীরত্ত্বের পরিচয় দিয়েছিল, সেই পাকিস্তানি হানাদার, বর্বর বাহিনী বাংলাদেশের মাটিতে, মা-বোনদের, ইস্টবেঙ্গল এর উপর আঘাত হানতে একটি বার ও দ্বিধা বোধ করেনি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের গর্জনে, আহ্বানে, ডাকে বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে তাদের বীরত্ত্ব প্রকাশ করতে একচুল হটেনি, ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতা সেই বেইমান দের কাছ থেকে যা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে।
রিলেটেড পোস্ট / আরো পড়ুন
Subscribe to our newsletter
Join our monthly newsletter and never miss out on new stories and promotions.