আজ - ২০ ভাদ্র ১৪৩৩, শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬ ১১:০০:০৯

ইসলামে উদ্বেগ ও হতাশার প্রতিকার | Remedies for anxiety and depression in Islam

মোঃ ফজলে রাব্বি
12 Aug, 2022
The Bangla Reader

জ্ঞানী ব্যক্তিদের মতে, একাকিত্ব বা শূন্যতা এবং দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন সামাজিক চাপ ও মানসিক ব্যাধিগুলির পিছনের কলকাঠি হিসেবে কাজ করে উদ্বেগ এবং বিষণ্নতা। এই মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাগুলো মহানবী (সা.) আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বস্ত বিশ্বাস স্থাপন এর মাধ্যমে সমাধান করেছেন। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেনঃ সূরা রা’দ: 28 - যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে; জেনে রাখ, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর সমূহ শান্তি পায়।



একজন বিশ্বাসী যে তার সৃষ্টিকর্তার সাথে যোগাযোগের সেতু প্রসারিত করে তার অবশ্যই একটি চমৎকার হৃদয়, শান্ত মন এবং বিবেক থাকবে। রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ “মুমিনের ব্যাপারটা কতই না চমৎকার! প্রকৃতপক্ষে, তার সমস্ত বিষয় তার জন্য ভাল। এটা মুমিন ছাড়া আর কারো জন্য নয়। তার ভালো কিছু হলে সে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, যা তার জন্য ভালো। এবং যদি তার সাথে খারাপ কিছু ঘটে তবে তার ধৈর্য্য রয়েছে, যা তার জন্য ভাল।" [সহীহ মুসলিম]

উদ্বেগ এবং বিষণ্নতার ভয়, দারিদ্র্যতা, অসুস্থতা বা সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ফলে হতে পারে। তবুও, একজন বিশ্বাসী, যিনি জানেন যে সবকিছুই আল্লাহ সর্বশক্তিমান দ্বারা পূর্বনির্ধারিত, তিনি ধৈর্য ধরে থাকবেন এবং সে যে কোন সমস্যায় পড়লে তার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট ঐশ্বরিক পুরস্কার চাইবেন। সুতরাং, এই ধরনের সমস্যা ও বিপর্যয় আল্লাহ পরাক্রমশালীর কাছ থেকে পুরস্কারে পরিণত হয় যেমনটি পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে:

সূরা আল বাক্বারাহ:

155 - এবং অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরীক্ষা করব কিছুটা ভয়, ক্ষুধা, মাল ও জানের ক্ষতি ও ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের।

156 - যখন তারা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয় আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তাঁরই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।

157 - তারা সে সমস্ত লোক, যাদের প্রতি আল্লাহর অফুরন্ত অনুগ্রহ ও রহমত রয়েছে এবং এসব লোকই হেদায়েত প্রাপ্ত।



যে কোন নিকটবর্তী হুমকি এবং ক্ষতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য; একজন আস্তিক মানুষ অনেক ধরনের হুমকি এবং ক্ষতির সম্মুখীন হবে, কিন্তু তিনি তা থেকে মুক্তি পেতে তিনি মহান আল্লাহ তায়ালার নিকটই পুনরুদ্ধারের জন্য সর্বদা চাইবে। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেনঃ

সূরা আল ইমরান:

173 - যাদেরকে লোকেরা বলেছে যে, তোমাদের সাথে মোকাবেলা করার জন্য লোকেরা সমাবেশ করেছে বহু সাজ-সরঞ্জাম; তাদের ভয় কর। তখন তাদের বিশ্বাস আরও দৃঢ়তর হয়ে যায় এবং তারা বলে, আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট; কতই না চমৎকার কামিয়াবীদানকারী।

174 - অতঃপর ফিরে এল মুসলমানরা আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে, তদের কিছুই অনিষ্ট হলো না। তারপর তারা আল্লাহর ইচ্ছার অনুগত হল। বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ অতি বিরাট।



উদ্বেগ ও হতাশার থেকে মুক্তির সর্বোত্তম সমাধান:

প্রার্থনা ও আল্লাহর স্মরণ

যখন কোনো ভুল ভ্রান্তি হয়ে যেতো, তখন নবী (সাঃ) নামাজে ছুটে যেতেন। তিনি বলতেন: “হে বিলাল, সালাতের জন্য ডাক দাও। এর মাধ্যমে আমাদের মুক্তি হবে।” তদনুসারে, অভ্যন্তরীণ শান্তি অর্জন, উদ্বেগ এবং শোক থেকে মুক্তি পাওয়ার অন্যতম প্রধান উপায় হচ্ছে প্রার্থনা।

শোক ও দুশ্চিন্তার সময়ে কিছু দোয়া ও স্মরণের বাণী সম্পর্কেও রাসূল (সা.) আমাদের উপদেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে:

দুঃখ দুশ্চিন্তার দুআ

اللّهُـمَّ إِنِّي عَبْـدُكَ

ابْنُ عَبْـدِكَ

ابْنُ أَمَتِـكَ

نَاصِيَتِي بِيَـدِكَ

مَاضٍ فِيَّ حُكْمُكَ

عَدْلٌ فِيَّ قَضَاؤكَ

أَسْأَلُـكَ بِكُلِّ اسْمٍ هُوَ لَكَ

سَمَّـيْتَ بِهِ نَفْسَكَ

أِوْ أَنْزَلْتَـهُ فِي كِتَابِكَ

أَوْ عَلَّمْـتَهُ أَحَداً مِنْ خَلْقِـكَ

أَوِ اسْتَـأْثَرْتَ بِهِ فِي عِلْمِ الغَيْـبِ عِنْـدَكَ

أَنْ تَجْـعَلَ القُرْآنَ رَبِيـعَ قَلْبِـي

وَنورَ صَـدْرِي

وجَلَاءَ حُـزْنِي

 

وذَهَابَ هَمِّـي

হে আল্লাহ, আমি তোমার বান্দা, তোমার পুরুষ বান্দার সন্তান এবং তোমার দাসীর সন্তান। আমার কপাল তোমার হাতে। আমার উপর তোমার বিচার সুনিশ্চিত এবং আমার ব্যাপারে তোমার ফয়সালা ন্যায়সঙ্গত। আমি তোমার প্রতিটি নাম ডেকে তোমার কাছে চাই যেই তুমি তোমার নাম রেখেছ, তোমার কিতাবে অবতীর্ণ করেছ, তোমার সৃষ্টির কাউকে শিখিয়েছ, অথবা তোমার কাছে অদৃশ্যের জ্ঞানে তোমার কাছে রেখেছ, কুরআনকে আমার হৃদয়ের বসন্ত করে তুলতে, এবং আমার বুকের আলো, আমার দুঃখের নির্বাসক এবং আমার কষ্টের উপশমকারী।

হিসনুন মুসলিম- ১২০

চাপ্টার -৩৪



আসমা’ বিনতু উমায়স (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে বিপদকালে পড়ার জন্য কয়েকটি বাক্য শিখিয়েছেনঃ 

"‏ اللَّهُ اللَّهُ رَبِّي لاَ أُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا ‏"‏ ‏.‏

“আল্লাহ্‌, আল্লাহ্‌, আমার প্রতিপালক, আমি তাঁর সাথে কোন কিছুই শরীক করি না”। [৩২১৪]

ফুটনোটঃ

[৩২১৪] আবূ দাউদ ১৫২৫। সহীহাহ ২৭৫৫। 

সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৮৮২

হাদিসের মান: সহিহ হাদিস

------

ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ:

নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিপদকালে নিম্নোক্ত  দুআ’ পরতেনঃ 

حَدَّثَنَا عَلِيُّ بْنُ مُحَمَّدٍ، حَدَّثَنَا وَكِيعٌ، عَنْ هِشَامٍ، صَاحِبِ الدَّسْتَوَائِيِّ عَنْ قَتَادَةَ، عَنْ أَبِي الْعَالِيَةِ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّ النَّبِيَّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ كَانَ يَقُولُ عِنْدَ الْكَرْبِ ‏ "‏ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ الْحَلِيمُ الْكَرِيمُ سُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ الْعَرْشِ الْعَظِيمِ سُبْحَانَ اللَّهِ رَبِّ السَّمَوَاتِ السَّبْعِ وَرَبِّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ ‏"‏ ‏.‏ قَالَ وَكِيعٌ مَرَّةً لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ فِيهَا كُلِّهَا ‏.‏

“আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোন ইলাহ নাই, তিনি পরম সহিষ্ণু, মহা সন্মানিত, পরম দয়ালু, মহান আরশের প্রভু আল্লাহ্‌ মহাপবিত্র, সাত আসমানের প্রভু ও মহান আরশের প্রভু আল্লাহ্‌ মহাপবিত্র”। একদা ওয়াকী (রাঃ) প্রতিটি বাক্যের সাথে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলেছেন। [৩২১৫]

ফুটনোটঃ

[৩২১৫] সহীহুল বুখারী ৬৩৪৫, ৬৩৪৬, মুসলিম ২৭৩০, তিরমিযী ৩৪৩৫, আহমাদ ২০১৩, ২২৯৭, ৩১৩৭, ৩৩৪৪। রাওদুন নাদীর ৬৭৯। 

সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ৩৮৮৩

হাদিসের মান: সহিহ হাদিস



তাই আল্লাহকে স্মরণ করা, তাঁর মহিমান্বিত, তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়া এবং প্রার্থনা করা মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার জন্য সর্বোত্তম, তাই পবিত্র কুরআনের আয়াত:

সূরা হিজর:

97 - আমি জানি যে আপনি তাদের কথাবর্তায় হতোদ্যম হয়ে পড়েন।

98 - অতএব আপনি পালনকর্তার সৌন্দর্য স্মরণ করুন এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান।

99 - এবং পালনকর্তার এবাদত করুন, যে পর্যন্ত আপনার কাছে নিশ্চিত কথা না আসে।



মহান আল্লাহ তায়ালা সকল ক্ষমতার মালিক। যিনি আমাদের সৃষ্টিকর্তা,পালনকর্তা, মহান বিচারক যার আশ্রয় ই সর্বোত্তম আশ্রয়। 

বিষন্নতা বা উদ্বেগ বা হতাশা গুলো থেকে নিজেকে মুক্ত করতে নিজেকে সম্পুর্ণ রুপে মহান আল্লাহ তায়ালার নিকট সমর্পণ করতে হবে। তবেই এর সহজ এবং সঠিক সমাধান আসবে।



রিলেটেড পোস্ট / আরো পড়ুন

Subscribe to our newsletter

Join our monthly newsletter and never miss out on new stories and promotions.